আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ২৪.১৯% কমলেও দেশে বেড়েছে ৭.১৪%

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে চাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দিয়েছিল সরকার। তাছাড়া সম্প্রতি কৃষকের ঘরে উঠেছে আমন ধান।

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে চাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দিয়েছিল সরকার। তাছাড়া সম্প্রতি কৃষকের ঘরে উঠেছে আমন ধান। এর পরও বাড়ছে চালের দাম। গত এক বছরে দেশের বাজারে চালের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে একই সময়ে চালের দাম ২৪ দশমিক ১৯ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

রমজান মাস সামনে রেখে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে টিসিবির তথ্য উদ্ধৃত করে বিটিটিসি বলছে, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। শুধু রমজানেই চাহিদা থাকে ৩০ লাখ টনের। বছরে দেশে চাল উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন। সেই হিসেবে দেশে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তবু ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চালের এলসি খোলা হয়েছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬৬ দশমিক ৪৩ টনের। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫২৬ দশমিক ৫১ টন।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ জানুয়ারি প্রতি কেজি মোটা চালের দর ছিল ৫০-৫৫ টাকা। আগের বছর একই সময়ে ছিল ৪৮-৫০ টাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫ জানুয়ারি প্রতি টন চালের দাম ছিল ৫২৫ ডলার। এক বছর আগে ছিল ৬৫২ ডলার।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ২৪ দশমিক ১৯ শতাংশ কমলেও দেশের বাজারে বেড়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। শুল্ক-কর ছাড় দেয়ার পরও দেশের বাজারে চালের দর কমেনি। গত ২০ অক্টোবর চাল আমদানিতে মোট শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ২২ শতাংশ করা হয়। ৩১ অক্টোবর বাকি শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে শুধু ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বহাল রয়েছে।

চালের বিষয়ে চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি পর্যায়েও যদি আমদানি করা যায়, করা উচিত। যে দেশ থেকে আমদানি করলে আমাদের দেশের চেয়ে কম দামে আনা যাবে, সে দেশ থেকেই আনতে হবে। কেউ যদি ষড়যন্ত্র করে ঘাটতিতে ফেলতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এক-আধ লাখ টন সরু চাল আমদানি করা জরুরি। মোটা চালের ঘাটতি নেই। আমি অনেক কিছু পারি, অনেক কিছু বুঝি—এ রকম অহমিকা করলে কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মানসম্মান ও শপথের অঙ্গীকারে ঘাটতি হবে। আমি বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবে।’

চাল ছড়াও তেল, চিনি, খেজুর, ডিম, পেঁয়াজ, আলুতেও আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেয়া হয়। তবে রমজানে আবশ্যকীয় পণ্য ছোলায় কোনো শুল্ক-কর ছাড় দেয়া হয়নি। মসুর ডালেও ছাড় দেয়া হয়নি। শুল্ক-কর ছাড় না দেয়া ছোলা ও মসুর ডালের বাজার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিটিটিসি। সংস্থাটি মনে করে, মসুর ডাল ও ছোলার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারে এ দুটো পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ মনিটর করা প্রয়োজন।

বিটিটিসির তথ্যমতে, বছরে ছোলার চাহিদা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টন। এর মধ্যে রমজানেই চাহিদা থাকে এক লাখ টন। দেশে উৎপাদন হয় মাত্র তিন হাজার টন। আমদানি হয় দেড়-দুই লাখ টন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৮০ দশমিক ৬৮ টন। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল ১৭ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫৮ টন।

বিটিটিসি বলছে, বছরে মসুর ডালের চাহিদা সাত লাখ টন। এর মধ্যে রমজানেই চাহিদা থাকে এক লাখ টন। দেশে উৎপাদন হয়ে ১ লাখ ৬৯ হাজার টন। আমদানি হয় পাঁচ লাখ টন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৫৬১ দশমিক ৫৪ টন। ২০২৩ সালের ১ জলাই থেকে ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৭ দশমিক ৯২ টন।

টিসিবির সূত্র দিয়ে বিটিটিসি বলছে, ৫ জানুয়ারি দেশের বাজারে প্রতি কেজি ছোলার খুচরা দর ছিল ১২০-১৩০ টাকা, যা ২০২৪ সালের একই দিন ছিল ৯০-৯৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দর ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ আর দেশের বাজারে ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ডালজাতীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় মসুর ডাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মসুর ডাল আমদানি ৭২ শতাংশ বেড়েছে। প্রথম পাঁচ মাসে এ ডাল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার টন। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৮ হাজার টন। সে হিসাবে পাঁচ মাসে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ।

ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সফি মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের দাম কমবে; বাড়বে না। রমজানে মসুর ডাল কম খায় বলে চাহিদাও কম থাকে। এখন ছোলার কেজি পাইকারিতে ১০০ টাকা, মসুর ডাল ১২২ ও বড় দানার মসুর ডাল ৯৬-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন ছোলা উঠলে দাম আরো কমে যাবে।’

তার পরও মসুর ডাল নিয়ে বিটিটিসির কেন শঙ্কা জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান (সচিব) ড. মইনুল খান কোনো মন্তব্য করেননি।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানিনির্ভর অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে স্থানীয় বাজারে কমার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সার ও জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য উৎপাদন ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহে ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত বৈদেশিক মুদ্রার মান ধরে রাখা প্রয়োজন এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতি ঠিক রাখা আবশ্যক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

কমিশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, স্থানীয় বাজারে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজারে মূল্য সহনশীল রাখতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের ফলে তা ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুম শুরু হওয়ায় পেঁয়াজের স্থানীয় মূল্য কমেছে। বাজারে শীতকালীন সবজি সরবরাহ বাড়ায় ডিম খাওয়া কমেছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ডিমের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্যে নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজমান থাকা এবং ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানোয় রমজানে ভোজ্যতেলের স্থানীয় মূল্য হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।

চালের স্থানীয় উৎপাদন কমায় সরকার চাল আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি দিয়েছে। প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টন চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। আমদানি করা চাল স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করলে মূল্যে স্থিতিশীলতা আসবে। রমজান সামনে রেখে খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর রেয়াত প্রদান ও শুল্কায়ন মূল্য যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে খেজুর আমদানির এলসি খোলার প্রবণতা বেড়েছে এবং রমজানে ভোক্তারা গত বছরের তুলনায় স্থানীয় বাজারে কম দামে খেজুর কিনতে পারবে। তবে মসুর ডাল ও ছোলার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারে এ দুটো পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ মনিটর করা প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে রমজানে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের স্থানীয় বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে কমিশন মনে করে।

আরও